শুকিয়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ইরাকের টাইগ্রিস নদী

শুকিয়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ইরাকের টাইগ্রিস নদী

ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে ইরাকের টাইগ্রিস নদী, যাকে আরবিতে দজলা বলা হয়। বিশ্লেষকদের সতর্কতা—এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নদীর তীরে বসবাসকারী প্রাচীন সম্প্রদায়গুলোর জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসবে। এই আশঙ্কা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

টাইগ্রিস নদীর তীরে বসবাসকারী প্রাচীন এক সম্প্রদায়ের নেতা শেখ নিধাম ক্রেইদি আল সাবাহি। ৬৮ বছর বয়সী এই ধর্মগুরু কেবল প্রবহমান নদীর পানিই ব্যবহার করেন। তার ভাষ্য, টাইগ্রিসের পানি পান করে তিনি কখনও অসুস্থ হননি এবং যতদিন নদী প্রবাহিত থাকে, ততদিন পানি পরিষ্কার থাকে—এমন বিশ্বাসই তিনি লালন করেন। তবে তার আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে নদীর এই প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে টাইগ্রিস মারাত্মক দূষণের শিকার, পাশাপাশি শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। নদী রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এর তীরবর্তী প্রাচীন সম্প্রদায়গুলোর জীবনধারা মৌলিকভাবে বদলে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ ইরাকের আমরাহ শহরে বসবাসকারী মান্দিয়ান ধর্মীয় নেতা শেখ নিধাম বলেন, ‘পানি না থাকলে জীবনও থাকে না।’

মান্দিয়ানরা বিশ্বের প্রাচীনতম জ্ঞানবাদী ধর্মগুলোর একটির অনুসারী। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ ইরাকের মেসান প্রদেশ, বিশেষ করে প্রাদেশিক রাজধানী আমরাহ অঞ্চলে তাদের বসবাস। এই শহরটি গড়ে উঠেছে টাইগ্রিস নদীর তীর ঘেঁষে।

মান্দিয়ানদের বিশ্বাসে পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের প্রতিটি বড় ধর্মীয় আচারেই শুদ্ধিকরণের জন্য পানির ব্যবহার অপরিহার্য। বিয়ের অনুষ্ঠান পানির মাধ্যমে শুরু হয় এবং জীবনের শেষ সময়ে চূড়ান্ত শুদ্ধিকরণের জন্যও নদীতে নেওয়া হয়।

শেখ নিধাম বলেন, ‘আমাদের ধর্মে পানির গুরুত্ব বাতাসের মতো। পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। বিশ্বাস অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে আদমের আগেও পানি ছিল এবং সৃষ্টির উপাদানগুলোর একটি ছিল পানি।’

টাইগ্রিস হলো সেই দুই ঐতিহাসিক নদীর একটি, যেগুলো মেসোপটেমিয়া সভ্যতাকে ঘিরে রেখেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে উৎপন্ন হয়ে নদীটি ইরাকের বড় শহর মসুল ও বাগদাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইউফ্রেটিস নদীর সঙ্গে মিলিত হয়।

এই দুই নদীর তীরেই মানবসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছে—এখানেই বড় পরিসরে কৃষির সূচনা, লেখালেখির বিকাশ এবং চাকার আবিষ্কার ঘটে। বর্তমানে টাইগ্রিসের পানি সেচ, পরিবহন, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি এর অববাহিকায় বসবাসকারী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের পানির চাহিদা মেটায় এই নদী।

তবে গত কয়েক দশকে টাইগ্রিসের স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। নদীতে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত ৩০ বছরে তুরস্ক টাইগ্রিসের ওপর একাধিক বড় বাঁধ নির্মাণ করেছে, যার ফলে বাগদাদে পৌঁছানো পানির পরিমাণ প্রায় ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে কৃষিখাতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের মোট ভূপৃষ্ঠের পানির অন্তত ৮৫ শতাংশই কৃষিতে ব্যবহৃত হয়।

জলবায়ু সংকট এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। ইরাকে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে এবং দেশটি গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে পড়েছে। চলতি বছরের গ্রীষ্মে টাইগ্রিসের পানির স্তর এতটাই নেমে গিয়েছিল যে অনেক জায়গায় মানুষ হেঁটেই নদী পার হতে পেরেছে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *