যুদ্ধের ক্ষত ভুলে নতুন জীবনের স্বপ্ন
দক্ষিণ গাজার ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে হাত ধরাধরি করে হাঁটছিলেন ইমান হাসান লাওয়া ও হিকমাত লাওয়া। ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাকে সজ্জিত নববধূ ইমান এবং স্যুট পরা হিকমাত যোগ দিয়েছিলেন এক গণবিবাহে, যেখানে আরও ৫৩ দম্পতি নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে একত্র হয়েছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার এই অনুষ্ঠানটি—মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর)—টানা দুই বছরের সংঘাত, মৃত্যু আর ধ্বংসের মাঝেও এক টুকরো আশার আলো দেখিয়েছে।
২৭ বছর বয়সি হিকমাত লাওয়া বলেন, “সবকিছুর পরও আমরা নতুন জীবন শুরু করছি। আল্লাহ চাইলে এখানেই এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।”
ফিলিস্তিনি সমাজে বিবাহ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার। তবে চলমান যুদ্ধের কারণে গাজায় বিয়ের অনুষ্ঠান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে এলেও আগের মতো জমকালো আয়োজন আর সম্ভব নয়।
দক্ষিণের খান ইউনিসে যখন মানুষ ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে নবদম্পতিদের অভিনন্দন জানাচ্ছিল, তখনো গাজার ভয়াবহ মানবিক সংকট সেই আনন্দকে ম্লান করে দিচ্ছিল। উপত্যকার ২০ লাখ মানুষের বেশিরভাগই ইমান ও হিকমাতের মতো বাস্তুচ্যুত। গাজার অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও আশ্রয়ের তীব্র সংকটে প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত কঠিন।
যুদ্ধের শুরুতে এই নবদম্পতি আশ্রয়ের খোঁজে দেইর আল-বালাহ এলাকায় পালিয়ে যান। সেখানে খাবার, পানি, আশ্রয়—সবই ছিল দুর্লভ। এখনো জানেন না বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে সাজাবেন তাদের নতুন জীবন। হিকমাত বলেন, “আমরা সবার মতোই সুখী হতে চাই। আগে স্বপ্ন ছিল একটি বাড়ি, একটি চাকরি, স্বাভাবিক জীবন। এখন স্বপ্ন শুধু—একটি থাকার মতো তাঁবু।”
তিনি আরও বলেন, “জীবন ধীরে ধীরে ফিরছে, কিন্তু আমরা যে স্বাভাবিকতার প্রত্যাশা করেছিলাম—তা এখনো অনেক দূরে।”
সাদা, লাল ও সবুজ রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত ইমান জানান, দীর্ঘ কষ্টের পর এই বিবাহ অনুষ্ঠান কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। তবে যুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন তাঁর বাবা-মা ও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইমান বলেন,
“এত শোকের পর আনন্দ অনুভব করা খুব কঠিন। আল্লাহ চাইলে আমরা আবার সবকিছু গড়ে তুলব।”
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক মানবিক সংস্থা ‘আল ফারেস আল শাহিম’ এই গণবিবাহের আয়োজন করে। নবদম্পতিদের উপহার হিসেবে তারা কিছু অর্থ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীও প্রদান করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইলের হামলায় গাজায় এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি। অধিকাংশ হতাহতই নারী ও শিশু। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে গাজার বৃহৎ অংশই পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।

