পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে রাজবাড়ীর পেট্রল পাম্প শ্রমিক রিপন সাহা (৩০)-এর পরিবার। আকস্মিক ও মর্মান্তিক এই মৃত্যুর পর পুরো পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে তাদের বসতভিটা।
নিহত রিপন সাহা ছিলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানখানাপুর সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা পবিত্র সাহার ছেলে। তিনি অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ মোড় এলাকার করিম ফিলিং স্টেশন (পেট্রল পাম্প)-এ তেল সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করতেন রিপন। তার আয়েই চলত পুরো সংসার, বাবা-মায়ের চিকিৎসা খরচসহ পরিবারের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হতো।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিপন সাহা ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, পরিশ্রমী ও সৎ একজন যুবক। পাম্পে দায়িত্ব পালনকালে তেলের টাকা আদায় করতে গিয়েই তাকে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাতে হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, একটি কালো রঙের জিপ গাড়িতে ৫ হাজার টাকার তেল সরবরাহ করার পর গাড়ির চালক ও মালিক টাকা না দিয়েই দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। টাকা আদায়ের জন্য রিপন গাড়ির সামনে দাঁড়ালে, তাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায় গাড়িটি। এতে ঘটনাস্থলেই রিপন গুরুতর আহত হন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো—ঘটনার আগের দিনই রিপনের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। পরিবারের দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। মুহূর্তেই সব আনন্দ আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
ঘটনার পর করিম ফিলিং স্টেশনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে রাজবাড়ী সদর থানা পুলিশ অভিযান চালায়। অভিযানে ঘাতক হিসেবে ব্যবহৃত ঢাকা মেট্টো-ঘ ১৩-৩৪৭৬ নম্বরের কালো রঙের জিপ গাড়িটি জব্দ করা হয়। একইসঙ্গে গাড়ির মালিক—২০১৯ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা রাজবাড়ী জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও ঠিকাদার আবুল হাসেম সুজন এবং গাড়ির চালক কামাল হোসেনকে রামকান্তপুর ও বানিবহ এলাকা থেকে আটক করা হয়।
এদিকে, ঘটনার রাতেই নিহত রিপন সাহার ছোট ভাই প্রদীপ সাহা রাজবাড়ী সদর থানায় হত্যা ও প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আবুল হাসেম সুজন ও চালক কামাল হোসেনকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জিপ গাড়িটি করিম ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসে। গাড়ি থেকে নেমে আসেন আবুল হাসেম সুজন। এরপর রিপন সাহা গাড়িটিতে ৫ হাজার টাকার তেল সরবরাহ করেন। টাকা না দিয়ে গাড়িটি দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে রিপন পেছনে দৌড় দেন। কিছুক্ষণ পর পাম্পের সামনের সড়কে রিপনের থেঁতলানো মুখ ও মাথাসহ মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, আবুল হাসেম সুজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সম্প্রতি তিনি একটি মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন বলেও জানা গেছে।
নিহত রিপনের পরিবার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছে। একইসঙ্গে স্থানীয়রা বলছেন, এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

