ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সোমালিল্যান্ডে পুনর্বাসনের একটি গোপন পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল— এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছে সোমালিয়া। দেশটির দাবি, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে সোমালিল্যান্ডের প্রশাসন। এই অভিযোগ সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— তবে কি সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে তেলআবিবের রয়েছে বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ?
সোমালিয়ার অভিযোগের পর বিষয়টি শুধু ফিলিস্তিন সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো হর্ন অফ আফ্রিকার ভূ-রাজনীতিতে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলটিতে শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
মূলত, সোমালিল্যান্ডের জন্য ইসরায়েলের স্বীকৃতি দীর্ঘদিনের একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই স্বীকৃতি নিছক রাজনৈতিক সমর্থন নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা। গত ডিসেম্বরে সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েলের স্বীকৃতির ঘোষণার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে— ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যে কি কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট। রেড সি বা লোহিত সাগরের কাছাকাছি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সোমালিল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এখান থেকে ইয়েমেন, পূর্ব আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করা সহজ। একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলের জন্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।
হর্ন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. হাসান খানেনজে বলেন, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি কেবল প্রতীকী কোনো পদক্ষেপ নয়। তার ভাষায়, “নিরাপত্তা ও সামরিক প্রয়োজনে যদি ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে ব্যবহার করে, তাহলে এটি রেড সি, ইয়েমেন এবং এমনকি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।” একই সঙ্গে এটি পুরো আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে সরাসরি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সোমালিয়া সরকার। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি নেতানিয়াহু প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের যেকোনো সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি এ পরিকল্পনাকে মানবাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবেও উল্লেখ করেন।
ফিকি আরও বলেন, ইসরায়েল যদি সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে তা সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। তিনি ইসরায়েলের কাছে এই কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান এবং একে দেশ বিভাজনের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, “আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত তথ্য পেয়েছি যে ইসরায়েলের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর করে সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর।”
আন্তর্জাতিক মহলে এই অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনি জনগণের পুনর্বাসনের নামে যদি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করা হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়— পুরো আফ্রিকা ও রেড সি অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের এই বিতর্কিত পদক্ষেপ সোমালিল্যান্ডকে হর্ন অফ আফ্রিকার নতুন আলোচিত ইস্যুতে পরিণত করেছে। যেখানে একদিকে ফিলিস্তিনি সংকট, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল— সবকিছু মিলেই এক জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

