অপরিশোধিত তেল বা পেট্রোলিয়াম আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি যেসব অঞ্চলে বিপুল তেল মজুদ রয়েছে—যেমন ভেনেজুয়েলা, সৌদি আরব কিংবা কাতার—সেসব এলাকার ভূরাজনৈতিক অবস্থানও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ খনি থেকে কোটি কোটি ব্যারেল তেল উত্তোলন করা হয়। তবে এই ‘ব্ল্যাক গোল্ড’-কে ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত মিথ রয়েছে—ডাইনোসরের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক।
তাহলে প্রশ্ন আসে, পেট্রোলিয়ামের সঙ্গে ডাইনোসরের সম্পর্ক আসলে কতটা সত্য? সময়ের বিবর্তনে আজকের এই জ্বালানি কীভাবে গড়ে উঠল, আর সেখানে বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীদের ভূমিকা কতখানি?
পেট্রোলিয়াম শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন ‘পেত্রা’ ও ‘ওলিয়াম’ থেকে—যার অর্থ যথাক্রমে পাথর ও তেল। অর্থাৎ পেট্রোলিয়াম বলতে মাটি বা পাথরের নিচ থেকে উত্তোলিত তেলকে বোঝানো হয়। এটি মূলত হাইড্রোকার্বনের একটি জটিল মিশ্রণ, যা লাখ লাখ বছর ধরে নানা ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে। এই অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে পাওয়া যায় পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিনসহ বিভিন্ন জ্বালানি, যা আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ডাইনোসর-তেল মিথের পেছনে একটি সময়কালগত যুক্তি রয়েছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে পাওয়া তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই মেসোজোয়িক যুগে গঠিত, যা প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের সময়। ট্রায়াসিক, জুরাসিক ও ক্রিটেসিয়াস—এই তিন পর্যায়ে বিভক্ত মেসোজোয়িক যুগকে সরীসৃপের যুগ বলা হয় এবং এই সময়েই ডাইনোসরদের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ফলে অনেকের ধারণা, ওই সময়কার প্রাণীদের—বিশেষ করে ডাইনোসরের—দেহাবশেষ থেকেই তেলের উৎপত্তি।
তবে আধুনিক বিজ্ঞান এই ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। বিজ্ঞানীদের মতে, অপরিশোধিত তেলের প্রধান উৎস কোনো বৃহৎ সরীসৃপ নয়, বরং কোটি কোটি ক্ষুদ্র শৈবাল ও প্ল্যাঙ্কটন। সমুদ্র ও হ্রদের তলদেশে জমে থাকা এসব অতি সূক্ষ্ম প্রাণী ও উদ্ভিদের দেহাবশেষ দীর্ঘ সময় ধরে পচন, তাপ ও চাপের প্রভাবে রূপান্তরিত হয়ে তেলের জন্ম দেয়।
এই প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে তৈরি হয় ‘কেরোজেন’—বিভিন্ন জৈব পদার্থের একটি মিশ্রণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভে চাপ ও তাপ বাড়তে থাকলে কেরোজেন ভেঙে হাইড্রোকার্বন চেইনে রূপ নেয়। একই সঙ্গে অ্যানেরোবিক ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করে। এর ফলেই ধীরে ধীরে তরল ও গ্যাসীয় হাইড্রোকার্বনের সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া প্রাচীন বনাঞ্চলের উদ্ভিজ্জ জৈব উপাদান থেকেও খনিজ তেল ও গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে—এমন ধারণাও বিজ্ঞানসম্মতভাবে স্বীকৃত। স্থলজ উদ্ভিদ থেকে তৈরি কেরোজেন থেকেও হাইড্রোকার্বন গ্যাস ও তেল জমতে পারে বলে মনে করেন গবেষকরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডাইনোসরের দেহাবশেষ থেকেই আজকের অপরিশোধিত তেলের উৎপত্তি—এটি পুরোপুরি সত্য নয়, আবার একেবারে ভিত্তিহীনও নয়। ডাইনোসরের বিলুপ্তি ও তাদের জৈব উপাদান হয়তো সামান্য অংশে তেল গঠনে ভূমিকা রেখেছে। তবে পৃথিবীর বিপুল পরিমাণ খনিজ তেলের মূল উৎস ডাইনোসর নয়। তাই তেলের উৎপত্তির ক্ষেত্রে ডাইনোসরকে কেন্দ্র করে যে বিশাল মিথ প্রচলিত রয়েছে, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও বৈজ্ঞানিক।

