ভোটের মাঠে এখন সুরের লড়াই, তারুণ্য ও প্রযুক্তিতে বদলে গেছে নির্বাচনী প্রচারণা

ভোটের মাঠে এখন সুরের লড়াই, তারুণ্য ও প্রযুক্তিতে বদলে গেছে নির্বাচনী প্রচারণা

চমকপ্রদ ছন্দ, সুর আর লিরিকের থিম সং-এ ভোটারদের এখন আকৃষ্ট করতে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণায় প্রথাগত মাইকিং আর পোস্টারিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। বাংলার চিরায়ত সৌন্দর্য আর সংস্কৃতির দৃশ্যায়নের পাশাপাশি দলগুলো এখন বেছে নিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে। বিশেষ করে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে রীতিমতো সৃজনশীল প্রতিযোগিতা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ভোট। গত তিন দফায় জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। বিনাভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের নির্বাচিত হওয়া কিংবা ভোটের সম্পূর্ণ রেশ ধরা দিতে ব্যর্থ হওয়া ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচন নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা মত। ভোটে উৎসব কিংবা মুখরিত সেই পরিবেশও যেন গত দেড় যুগ ধরে হারিয়ে গেছে।

যখন নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রভাবক অনুপস্থিত থাকে বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না, তখন স্বভাবতই ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে প্রার্থী ও দলগুলোর চিন্তা কমই থাকে। তবে, সময় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্বায়নের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ডিজিটাল মিডিয়া এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। দলীয় থিম সং, স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও এমনকি প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেয়া প্যারোডি বা মক-ও দেখা যায় আজকাল। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ আরও ছোট কিছু দল তাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠনের ব্যানারে বানিয়েছে এরকম অন্তত ডজনখানেক গান। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মূল থিম সং।

বিএনপি’র ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করেছে তাদের অফিসিয়াল থিম সং— ‘ভোট দিবেন কিসে, ধানের শীষে’। গানটিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’সহ দলের স্লোগানগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। আবহমান বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি আর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ফুটে উঠেছে এর প্রতিটি সুরে। ইউটিউব ও ফেসবুকে গানটি প্রকাশের পর থেকেই তা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে।    

অন্যদিকে, ভিন্নধর্মী এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী থিম সং উদ্বোধন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজধানীর শাহবাগে মাদুর পেতে বসে দলের নেতাকর্মীরা সুরে সুরে প্রকাশ করেন তাদের গান— ‘ভোটের মিছিলে আমার প্রতীক শাপলা কলি’। এই থিম সং-এ ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি, তরুণদের যাপিত জীবন এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা গুরুত্ব পেয়েছে। এনসিপি নেতাদের দাবি, সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবিই তাদের প্রচারণার মূল হাতিয়ার।  

নির্বাচনী থিম সং-এর এই প্রচারণার মিছিলে পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামীও। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু প্রকাশ করা হইনি তবে দলটির সমর্থক-কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি থিম সং প্রচার করেছেন।

প্রযুক্তির এই নতুন জোয়ারে অংশ নিয়েছে নির্বাচন কমিশনও। ভোটারদের পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রচার করা হচ্ছে বিশেষ সচেতনতামূলক থিম সং, যেখানে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোটের প্রক্রিয়া দেওয়া হচ্ছে নিয়ে বিশেষ বার্তা ।  

মূলত, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে উজ্জীবিত হওয়া তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করেই করা হয়েছে এবারের ডিজিটাল প্রচারণা কনটেন্টগুলো। সেই সময়ের সাহসী গান যেমন- ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ কিংবা ‘তোমার বিচার করবে কে?’ এর মতো লিরিকগুলো যেমন আন্দোলনের শক্তি জুগিয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলো এখন ঠিক সেইরূপ শক্তিশালী লিরিক দিয়ে তরুণদের মন জয়ের চেষ্টা করছে।  

শব্দদূষণ আর যানজট তৈরি করার মূলধারার প্রচারণার চেয়ে ডিজিটাল এই নতুন ধারার প্রচারণাকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের সাধারণ মানুষও। পছন্দের প্রতীক, দল ও মার্কার প্ররাচনার সঙ্গে এই গানগুলোর চুম্বক অংশ শেয়ার দেয়ার পাশাপাশি তারা তৈরি করছে রিলস ভিডিও।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *