জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট কখনও আদর্শভিত্তিক ছিল না— বলছেন বিশ্লেষকরা

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট কখনও আদর্শভিত্তিক ছিল না— বলছেন বিশ্লেষকরা

ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট কখনোই আদর্শভিত্তিক কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক জোট হিসেবে গড়ে ওঠেনি—এমন মন্তব্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই জোট মূলত ইসলামকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচনী আসন সমঝোতার একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। আদর্শিক ঐক্যের অভাব, নেতৃত্ব সংকট এবং স্বার্থের সংঘাতের কারণেই ১১ দলীয় জোট ভেঙে শেষ পর্যন্ত ১০ দলে সীমাবদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। বিশ্লেষকদের দাবি, ভোটের মাঠে এই জোটের বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব খুবই সীমিত, বরং যেকোনো সময় ভাঙনের ঝুঁকি আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।

মূলত জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক শুরু থেকেই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব কখনোই পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই দূরত্ব কমাতে সক্রিয় হন ইসলামপন্থী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। সে সময় ‘ওয়ান বক্স পলিসি’—অর্থাৎ ইসলামপন্থী দলগুলোর সব ভোট এক বাক্সে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসসহ আটটি সমমনা দল একটি মোর্চা গঠন করে। এই মোর্চা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কারসহ পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনে নামে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আন্দোলনের পথ থেকে সরে এসে জোটের নেতারা মনোযোগ দেন আসন ভাগাভাগির দিকে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বাইরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) আসন সমঝোতার আলোচনায় যুক্ত হয়। এর ফলে আসন বণ্টনের আলোচনা রূপ নেয় ১১ দলীয় ঐক্যে। তবে এই তিনটি দলকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ আপত্তি তোলে। তাদের মতে, ইসলামপন্থার ব্যানারে গঠিত জোটে ধর্মনিরপেক্ষ বা ভিন্ন আদর্শের দল যুক্ত হওয়ায় মূল উদ্দেশ্য ক্ষুণ্ন হয়েছে।

এই মতবিরোধের প্রভাব পড়ে আসন বণ্টনের আলোচনাতেও। জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দল ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ যেখানে শুরুতে ১০০ আসনের দাবি করেছিল, সেখানে শেষ পর্যন্ত তা কমে দাঁড়ায় ৫০ আসনে। তবুও জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়।

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে—যে জোট ইসলামি আদর্শ ও মূল্যবোধের কথা বলে গঠিত হয়েছিল, তা কি আদতে ক্ষমতায় যাওয়ার একটি রাজনৈতিক মাধ্যম ছাড়া আর কিছু ছিল? আদর্শিক ঐক্যের পরিবর্তে ক্ষমতা ভাগাভাগির রাজনীতিই কি এই জোটের মূল চালিকাশক্তি—এমন প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করেন, ভোটে জিতে সরকার গঠন করা হলে মন্ত্রিপরিষদে কার অবস্থান কী হবে, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন কিংবা কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন—এসব বিষয় নিয়েই জোটের ভেতরে একটি ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ কাজ করছে। তিনি বলেন, যদি এই ১০ দলীয় জোট দীর্ঘ সময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, তাহলে তারা একটি রাজনৈতিক ফ্যাক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে যদি অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার ভাঙনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে জনগণের আস্থা দ্রুতই হারাবে এই জোট।

ড. কাজী মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, যেসব দলের আগে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই বা ক্ষমতার চর্চা সীমিত, তারা সরকারে গেলে কিংবা প্রধান বিরোধী দল হলে—উভয় ক্ষেত্রেই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব জোটের স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতায় নির্বাচনী মাঠে জামায়াতে ইসলাম ছাড়া অন্য দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংক তুলনামূলকভাবে দুর্বল। তবে জোট যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো একটি দল এককভাবে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারবে না। বিপরীতে, জোটে বারবার ভাঙন দেখা দিলে জনমনে আস্থাহীনতা বাড়বে এবং ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুব কায়সার বলেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর সংসদের জন্য কোনো একক দল নয়, বরং শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, দুইটি দল বা দুইটি শক্তিশালী জোট থাকলে সংসদ আরও প্রাণবন্ত হবে এবং কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে না।

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামী ২০ জানুয়ারি। এর আগেই সব রাজনৈতিক দল ও জোটকে আসন সমঝোতার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে হবে। তবে এরই মধ্যে যে অবিশ্বাস ও ফাটল তৈরি হয়েছে, তাতে জোট আনুষ্ঠানিকভাবে টিকে গেলেও আদর্শিক ঐক্য ও পারস্পরিক আস্থার ভবিষ্যৎ কতটা দৃঢ় থাকবে—সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *