কেরানীগঞ্জে মা-মেয়ে খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন ঘাতক দুই বোন

কেরানীগঞ্জে মা-মেয়ে খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন ঘাতক দুই বোন

ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিখোঁজের প্রায় ২০ দিন পর স্কুলছাত্রী ফাতেমা ও তার মা রোকেয়া রহমানের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও শিউরে ওঠার মতো তথ্য। মাত্র দেড় লাখ টাকার ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এবং ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই এই নির্মম জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন ফাতেমার গৃহশিক্ষিকা মীম ও তার ছোট বোন নুরজাহান।

গ্রেপ্তারকৃত মীম ও নুরজাহানের দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) কেরানীগঞ্জ মডেল থানা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম।

ওসি জানান, গৃহশিক্ষিকা মীমের সঙ্গে ভুক্তভোগী রোকেয়া রহমানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিশ্বাসের জায়গা থেকে রোকেয়া রহমান গ্যারান্টর হয়ে মীমকে তিনটি এনজিও থেকে মোট দেড় লাখ টাকা ঋণ নিতে সহায়তা করেন। তবে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় দুজনের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয় এবং প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হতো।

এ ছাড়া নুরজাহানের দাবি অনুযায়ী, রোকেয়া রহমান ও তার মেয়ে ফাতেমা প্রায়ই মীমকে তাচ্ছিল্য করে কথা বলতেন, যা থেকে দুই বোনের মনে গভীর ক্ষোভ ও প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি হয়।

ঘটনার দিন, ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা (১৪) নিয়ম অনুযায়ী পড়তে যায় তার শিক্ষিকা মীমের বাসায়। সেখানে আগে থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নুরজাহান ফাতেমাকে গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে এবং সিসিটিভি ফুটেজে বিভ্রান্তি ছড়াতে নুরজাহান মৃত ফাতেমার কাপড় খুলে নিজের কাপড় পরিয়ে দেয় এবং নিজে ফাতেমার পোশাক পরে বাসা থেকে বের হয়। এতে ফুটেজে দেখে মনে হয়, ফাতেমা সুস্থ অবস্থায় বাসা ছেড়ে যাচ্ছে।

এরপর মীম কৌশলে ফাতেমার মা রোকেয়া রহমানকে ফোন করে জানায়, তার মেয়ে অসুস্থ। খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন রোকেয়া দ্রুত মীমের বাসায় পৌঁছান। ঘরে ঢুকতেই নুরজাহান পেছন থেকে ওড়না দিয়ে তার গলায় প্যাঁচ দেয় এবং মীম তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। পরে দুই বোন মিলে শ্বাসরোধ করে রোকেয়া রহমানকেও হত্যা করে।

হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ লুকাতে মা রোকেয়ার লাশ খাটের বক্সের ভেতরে এবং মেয়ে ফাতেমার লাশ বাথরুমের ফলস সিলিংয়ের ওপর গোপন করে রাখা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘটনার পরও খুনি দুই বোন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে থাকেন। এমনকি ৬ ও ৭ জানুয়ারি তারা ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নানির বাড়িতে গিয়ে একটি শিশুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। ১০ জানুয়ারি পুনরায় তারা কেরানীগঞ্জের ওই বাসায় ফিরে আসেন।

দীর্ঘদিন ধরে ঘর থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে মীম তার স্বামী হুমায়ুনকে সেটিকে ‘মরা কুকুরের গন্ধ’ বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে বৃহস্পতিবার রাতে গন্ধ অসহনীয় হয়ে উঠলে হুমায়ুন নিজেই খাটের নিচে খোঁজ নিতে গিয়ে একটি মরদেহ দেখতে পান এবং বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

ওসি এম সাইফুল আলম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মীম ও তার বোন নুরজাহান স্বীকার করেছে যে ঋণের চাপ এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেই তারা এই জোড়া খুন ঘটিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে ফাতেমার পোশাকে অন্য একজনকে বের হতে দেখা যায়, যা ছিল মূলত নুরজাহানের ছদ্মবেশ।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রনি জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও পরবর্তী অপহরণ মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়েছে। মূল অভিযুক্ত মীম ও নুরজাহানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তারা আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ মীম, তার দুই বোন এবং স্বামী হুমায়ুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। প্রাথমিক তদন্ত ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মীম ও নুরজাহানকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *