সারাংশ: আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে ‘সংস্কার’— বাংলাদেশের ডিজিটাল খাতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও বাস্তবতা
আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হচ্ছে ‘সংস্কার’। বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন—এই তিন লক্ষ্য নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ শুরু করেছে। ১৫ বছরের জবাবদিহিহীনতার ফলে বহু প্রতিষ্ঠান নষ্ট হয়ে পড়ায়—সংস্কার এখন রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য শর্ত।
তথ্যপ্রযুক্তি এখন নাগরিক সেবা, কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা, ব্যাংকিং—সব ক্ষেত্রের ভিত্তি। কিন্তু এই খাতকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ডিজিটাল ডিভাইড, দুর্বল কানেকটিভিটি ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ঘাটতি।
১. কানেকটিভিটিতে সংস্কার: ধীর অগ্রগতি, বড় সম্ভাবনা
ডিজিটাল ডিভাইডের মূল কারণ
- সারাদেশে ব্রডব্যান্ড পৌঁছায়নি
- মোবাইল ডেটা ব্যয়বহুল—স্পিডও অনির্ভরযোগ্য
- আগের সরকারের দেওয়া অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্সিং, একচেটিয়া অপারেটর সুবিধা
সমাধান ও চলমান পরিবর্তন
- টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কিং ও লাইসেন্সিং পলিসি ২০২৫:
অপ্রয়োজনীয় বহু লেয়ার বাতিল হবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে, দাম কমবে। - ব্রডব্যান্ডের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু মোবাইল ডেটার দাম এখনও প্রায় অপরিবর্তিত—ফলে প্রান্তিক মানুষ AI–চালিত সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
- স্টারলিংক অনুমোদন: বড় অর্জন, তবে খরচ বেশি। ভবিষ্যতে স্থানীয় উদ্যোক্তারা গ্রামে ব্রডব্যান্ড দিতে এটি ব্যবহার করতে পারবে।
২. ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা
এনআইডি ও ডিপিআই সংকট
- ভারত ও পাকিস্তান ডিপিআই–এ বহু এগিয়ে হলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে।
- এনআইডি চালু হয়েছিল ২০০৭ সালে, কিন্তু আজও অনলাইন নাগরিক সেবার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারেনি।
- আগের সরকারের “পরিচয়” প্রজেক্টে অনিয়ম ও ডেটা পাচারের অভিযোগে এটি বন্ধ করা হলেও বিকল্প কোনো জাতীয় ডেটা অথরিটি এখনো গঠন হয়নি।
- নির্বাচন কমিশনের হাতে এনআইডি থাকায় প্রযুক্তিগত ভিশন বাস্তবায়নও সম্ভব হচ্ছে না।
বড় সংস্কারের দাবি
- জাতীয় এনআইডি অথরিটি গঠন
- ১৮ বছরের নিচের নাগরিকদের ডেটা অন্তর্ভুক্ত করা
- রাষ্ট্রীয় পরিচয় ডেটার কার্যকর ব্যবহারে নীতিগত পরিবর্তন
৩. আইনগত সংস্কার: কিছু অগ্রগতি
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫
- বিতর্কিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল
- নাগরিক অধিকার সুরক্ষা
- নতুন ধরনের সাইবার অপরাধের কঠোর শাস্তি
- হয়রানি এড়াতে জামিনযোগ্যতার নিশ্চয়তা
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ (পিডিপিও)
- নাগরিক তার ডেটার মালিক হবে
- ডেটা শেয়ারিং ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের নতুন সুযোগ
- ফিনটেক, ই-হেলথ, ই-লার্নিং, ইন্স্যুরেন্স—সব খাতে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সম্ভাবনা
৪. ডিজিটাইজেশনের নামে অপচয় বন্ধে বড় ধরনের সংস্কার দরকার
গত ১০–১৫ বছর সরকারি আইটি প্রকল্পে:
- অপ্রয়োজনীয় সার্ভার, ল্যাব, কম্পিউটারের নামে বিপুল অপচয়
- সিস্টেম নির্মাণের বদলে ইনফ্রাস্ট্রাকচার কেনায় জোর
- ফল: অকার্যকর প্ল্যাটফর্ম, ব্যবহারহীন সিস্টেম
সমাধান: বৈশ্বিক মানের ডিজিটাইজেশন মডেল
- ক্লাউড–ভিত্তিক SaaS ব্যবহার
- ইউজার–ভিত্তিক পেমেন্ট
- অপচয় কমে, জবাবদিহি বাড়ে
- পাবলিক–প্রাইভেট মডেলে নাগরিক সেবা দ্রুত ও টেকসই হয়
উপসংহার
অন্তর্বর্তী সরকারের সূচিত সংস্কারগুলো—টেলিকম নীতি, ডেটা সুরক্ষা আইন, সাইবার আইন, স্টারলিংক—ইতিবাচক সূচনা হলেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
সর্বোচ্চ অগ্রগতি পেতে হলে—
- এনআইডি–কেন্দ্রিক ডিপিআই তৈরি
- মোবাইল ডেটার দাম কমানো
- সরকারি ডিজিটাইজেশন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন
- নীতিনির্ধারকদের প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন
এই পরিবর্তনগুলো না হলে তথ্যপ্রযুক্তি–ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব হবে, আর ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্যও অপূর্ণ থেকে যাবে।

