ইতিহাসে বিচারের মুখোমুখি হওয়া রাষ্ট্রপ্রধানরা

ইতিহাসে বিচারের মুখোমুখি হওয়া রাষ্ট্রপ্রধানরা


গত বছর জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও দুই আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় ঘোষিত হবে আজ। তবে ইতিহাসে তাকালেই দেখা যায়—তিনি প্রথম ক্ষমতাচ্যুত নেতা নন যাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বহু রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতা হারানোর পর আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। চলুন তাঁদের কয়েকজনের পরিণতি দেখে নেওয়া যাক।


নিকোলাই চচেস্কু

ঠাণ্ডা যুদ্ধের উত্তুঙ্গ সময়ে পূর্ব ইউরোপ সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রোমানিয়ার নেতা নিকোলাই চচেস্কু মস্কোর প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শুরুতে ‘হিরো’ হিসেবে পরিচিতি পান। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর দ্রুত বদলে যান তিনি।

১৯৬৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর কয়েক বছরের মধ্যেই রাষ্ট্রের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। ১৯৭১ সালে চীন ও উত্তর কোরিয়া সফরের পর কিম ইল সুং ও মাও সেতুংয়ের আদলে ব্যক্তিপূজাভিত্তিক শাসন কায়েম করেন। গোয়েন্দা সংস্থা সিকিউরিটেট হয়ে ওঠে দমন-পীড়নের অস্ত্র; দেশের প্রতি ৪৩ জনে একজন ছিল তাদের এজেন্ট।

অর্থনৈতিক দুর্দশা, রপ্তানি বাড়াতে খাদ্য সংকট এবং জ্বালানি ঘাটতি—সব মিলিয়ে জনঅসন্তোষ তীব্র হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে টিমিসোয়ারায় সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী জনতার পাশে দাঁড়াতেই চচেস্কুর পতন দ্রুত ঘনিয়ে আসে।

২২ ডিসেম্বর তিনি ও তার স্ত্রী এলেনা দেশত্যাগের চেষ্টা করলে ধরে ফেলা হয়। ২৫ ডিসেম্বর সামরিক আদালতে দুই ঘণ্টার বিচারে তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় ও অর্থনীতি ধ্বংসের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দু’জনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে রায় কার্যকর করা হয়। বিচার দ্রুত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা থাকলেও রোমানিয়ার জনগণের বড় অংশের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের প্রতিশোধ।


সাদ্দাম হোসেন

ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং আট মাস পর গ্রেপ্তার হন। বাগদাদে তাকে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।

১৯৮২ সালে দুজাইল শহরে সরকারবিরোধী হামলার পর ১৪৮ শিয়া নাগরিককে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আপিল করেও রায় পরিবর্তন না হওয়ায় ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।


হোসনি মোবারক

প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় থাকা মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক আরব অঞ্চলের প্রথম নেতা হিসেবে সাধারণ আদালতে বিচারের মুখোমুখি হন। তাহরির স্কয়ারে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।

তবে বহু মামলায় তিনি খালাস পান এবং শেষ পর্যন্ত শুধু একটি দুর্নীতি মামলায় ছোটো পরিসরের সাজা ভোগ করেই মুক্তি পান।


হিসেন হাব্রে

চাদের সাবেক স্বৈরশাসক হিসেন হাব্রের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অনুষ্ঠিত হয় সেনেগালে গঠিত ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি আফ্রিকান চেম্বারস’-এ। ২০১5 সালে বিচার শুরু হয়ে ২০১৭ সালে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আফ্রিকার ইতিহাসে এই বিচার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির।


নির্বাসনে পালানো নেতারা

ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ

ইউক্রেনের রাশিয়াপন্থি প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে পার্লামেন্ট তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তিনি দ্রুত রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন।

বাশার আল-আসাদ

দুই যুগ সিরিয়ার ক্ষমতায় থাকা বাশার আল-আসাদ রাশিয়ার সমর্থনে দীর্ঘসময় টিকে থাকলেও গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বিদ্রোহীদের অভিযানে তার পতন ঘটে বলে জানা যায়। পরে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়—মানবিক কারণে মস্কো তাকে ও তার পরিবারকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে।


বিশ্বরাজনীতি প্রমাণ করেছে—ক্ষমতা হারানোর পর একেক নেতার পরিণতি একেক রকম। কেউ কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হন, কেউ পালিয়ে নির্বাসনে জীবন কাটান, আবার কেউ জনঅসন্তোষের ঝড়ে নির্মম পরিণতির শিকার হন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *